Ticker

6/recent/ticker-posts

রাজনৈতিক মতভেদের বিপরীতে সহনশীলতার চর্চা: ইসলাম ও সামাজিক শান্তির দৃষ্টিভঙ্গি

 



রাজনীতি যখন অসহষ্ঞিুতা, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সমাজ তার নৈতিক ভারসাম্য হারায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই কঠিনতর পরিস্থিতিতে ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় যে, ইসলাম রাজনীতিকে শত্রুতা নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখে; আধিপত্য নয়, ন্যায় ও সহনশীলতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করতে চায়। ইসলামের রাজনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো ইনসাফ, মানবিক মর্যাদা ও মতভেদের প্রতি সহনশীলতা।


পবিত্র কোরআন প্রথমেই মানুষের মধ্যে পার্থক্য ও মতভেদকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, Èআর যদি তোমার প্রতিপালক চাইতেন, তবে তিনি মানুষকে এক জাতিই করতেন; কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।' (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮)

এই আয়াত প্রমাণ করে, মতের বৈচিতর্্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর পরিকল্পনারই অংশ। ফলে ভিন্ন রাজনৈতিক মত বা অবস্থানকে নির্মূল করার চষ্টো ইসলামের মেৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


ইসলামের রাজনৈতিক সহনশীলতার আরেকটি মূলনীতি হলো ন্যায়বিচার, এমনকি বিরোধীদের ক্ষেত্রেও। পবিত্র কোরআন স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেয়, Èহে মুমিনরা! আল্লাহর জন্য ইনসাফের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দঁাড়াও এবং ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দাও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ইনসাফ থেকে বিরত না করে।' (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৮)


এই আয়াত রাজনৈতিক বিরোধিতার ক্ষেত্রে একটি চূড়ান্ত নৈতিক সীমা নির্ধারণ করে দেয়। শত্রুতা বা মতভেদ কখনোই অবিচারের বৈধতা দিতে পারে না। সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের অর্থ অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়; বরং ন্যায় থেকে বিচু্যত না হওয়া।


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা রাষ্ট্র ছিল রাজনৈতিক সহনশীলতার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত। মদিনা সনদে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে স্বীকৃত ছিল। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রতি জুলুম করবে বা তার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে মামলা করব।' (আবু দাউদ, হাদিস: ৩০৫২)


এই হাদিস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা ও ভিন্ন মতাবলম্বিদের অধিকার রক্ষায় ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কখনোই দমন-পীড়নের লাইসেন্স নয়।


ইসলামে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও পরামর্শের পরিবেশকেও উত্সাহ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি বৈশষ্ট্যি হিসেবে বলা হয়েছে, Èতাদের কার্যাবলি পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।' (সুরা শূরা, আয়াত: ৩৮)


ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকের একক সদ্ধিান্ত নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়াই ইসলামের নির্দেশ। এখানেই রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।


রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ভিন্নমতের প্রতি ধৈর্য ও শালীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একবার এক বেদুঈন মসজিদে অশোভন আচরণ করলে সাহাবারা তাকে কঠোরভাবে দমন করতে চাইলে মহানবী (সা.) তাদের থামিয়ে দেন এবং নরম ভাষায় তাকে বুঝিয়ে দেন। (বুখারি, হাদিস: ২১৯) 

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, ইসলামী নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়া নয়, প্রজ্ঞাই মুখ্য।


ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখেন, যদিও তা কাফের হয়; আর জুলুমের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে ধ্বংস করেন, যদিও তা মুসলিম হয়।' (আস-সিয়াসাতুশ শরইয়্যাহ) 


এই বক্তব্য ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের সারকথা স্পষ্ট করে দেয়। সহনশীলতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সামাজিক শানি্তর পূর্বশর্ত।

ইসলাম রাজনৈতিক বিরোধিতাকে শত্রুতে রূপান্তর করতে নিষেধ করে। পবিত্র কোরআন বলে, Èভালো ও মন্দ এক নয়। মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করো।' (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪)


এই নীতি রাজনৈতিক ভাষা, আচরণ ও কেৌশলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কটু বক্তব্য, অপমান ও উসকানি সমাজকে বিভক্ত করে; সহনশীলতা সমাজকে সংহত করে।

উপরোক্ত আলোচনার পর দৃঢ়তার সহিত বলা যায় যে ইসলামের সহনশীল রাজনৈতিক নীতি কোনো কেৌশলগত আপস নয়; এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। মতভেদ থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা ন্যায়, শালীনতা ও মানবিক মর্যাদার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। বর্তমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ইসলামী নীতি নতুন করে ভাবার সুযোগ দেয়। কীভাবে শক্ত অবস্থান নিয়েও সহনশীল থাকা যায়, কীভাবে বিরোধিতা করেও ইনসাফ বজায় রাখা যায়। 

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ন্যায়, ইনসাফ আর সহনশীল রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


Post a Comment

0 Comments