ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নিন্দিত একটি আচরণ হলো বিদ্বেষ। এটি মানুষের অন্তরের ভয়ংকর ব্যাধিগুলোর একটি। এই ব্যাধি মানুষের দৃষ্টি এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে সত্য তার সামনে স্পষ্ট হলেও সে তা স্বীকার করতে পারে না। মানুষ যার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তার কোনো ভালো গুণ সে চোখে পড়ে না। সে যত ভালোই হোক, যত আন্তরিকই হোক তাকে প্রত্যাখ্যান করতে বা কষ্ট দিতে মানুষ পিছপা হয় না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাফির, ইহুদি ও মোনাফেকরা মহানবী (সা.)-এর সত্যতা ও অবদান জানার পরও শুধু বিদ্বেষের কারণে তাঁকে আজীবন কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন ও অগণিত নিয়ামত তাদের হেদায়েত গ্রহণে উৎসাহ দেয়নি, বরং সর্বদা শত্রুতায় লিপ্ত রেখেছে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা অন্যায় ঔদ্ধত্যভরে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখো, ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল!’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৪)
ad
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে মানুষ অনেক সময় সত্য জেনেও বিদ্বেষ ও অহংকারের তা অস্বীকার করে। যেমনটা করেছিল ইহুদিরা। তারা জানত যে মহানবী (সা.) শেষ নবী। কিন্তু তারা তাদের বিদ্বেষের কারণে তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দিত না।
তাদের হঠকারিতার কারণে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাদেরকে আমি কিতাব প্রদান করেছি তারা তাকে এরূপভাবে চিনে, যেমন চিনে তারা আপন সন্তানদের এবং নিশ্চয়ই তাদের একদল জ্ঞাতসারে সত্যকে গোপন করছে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৬)
ইহুদি ও মোনাফেকরা মহানবী (সা.)-এর চারিত্রিক পবিত্রতা, আমানতদারি ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিল। তবু তারা বিদ্বেষের কারণে তাঁর ওপর কখনো মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ করেছে আবার কখনো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও করেছে।
বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে সত্য প্রত্যাখানের এই প্রবণতা বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। বিদ্বেষ মানুষের মধ্যে confirmation bias তৈরি করে।
‘কনফারমেশন বায়াস’ হলো, মানুষের চিন্তাধারার একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রবণতা। এতে আক্রান্ত মানুষ কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বা বিশ্বাসের বৃত্তে আটকে থাকে। ফলে সে তার সেই মতবাদ বা বিশ্বাসের সপক্ষে প্রমাণ জোগাড় করতে চায়। এ ক্ষেত্রে যেসব প্রমাণ বা নিদর্শন তার মতবাদ বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়, তা যত শক্তিশালী বা স্পষ্টই হোক না কেন, মানুষটি সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া বা সেটিকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করে থাকে। এর বিপরীতে তার মনে জন্মানো বিশ্বাস বা মতবাদের অনুকূলে থাকা প্রমাণ বা নিদর্শন যত দুর্বলই হোক না কেন, সেগুলোকে সে গুরুত্বসহকারে নিয়ে তার বিশ্বাস বা মতবাদকে আরো সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।
ফলে তারা বিদ্বেষের জায়গাগুলোতে কখনো সঠিক ও সত্য গ্রহণ করতে পারে না। এ জন্যই হয়তো ইসলামের দৃষ্টিতে বিদ্বেষকে এতটা জঘন্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে (শবেবরাতে) অবতীর্ণ হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া তাঁর সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৯০)
অহেতুক বিদ্বেষ পোষণ করা কতটা জঘন্য কাজ হলে মহান রাব্বুল আলামিনের এই সাধারণ ক্ষমা থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হয়। তাই আমাদের সবার উচিত, বিদ্বেষ পরিহার করা। নিজের অহংকারকে এক পাশে রেখে সত্যটা অনুভব করার চেষ্টা করা। মানুষকে ভালোবাসা।





0 Comments