Ticker

6/recent/ticker-posts

জুমার দিনের বিশেষ ৬টি আমল: কোরআন ও হাদিসের আলোকে বরকতময় আমল




 ক্ষুদ্র এই পৃথিবীতে পথ চলার মাঝে আমাদের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে যেন আমাদের থামিয়ে দেন- বলতে চান, ‘আমার জন্য একটু সময় দাও।’


জুমার দিন ঠিক তেমনই একটি সময়। এটি কেবল একটি নামাজের দিন নয়; বরং হৃদয় ধোয়ার দিন, আত্মা পরিশুদ্ধ করার দিন, রবের দরবারে নতুন করে ফিরে যাওয়ার দিন।


এ দিনের রয়েছে বিশেষ কিছু করণীয় আদব ও আমল। সেগুলো হলো- গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার, আগেভাগে মসজিদে যাওয়া, সুরা কাহফ তিলাওয়াত, বেশি বেশি দরুদ পাঠ ও খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা।


ad

১️. গোসল করা


শুধু শরীর নয়—এই গোসল যেন হয় গুনাহ থেকে ফিরে আসার প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-


غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ


‘জুমার দিনের গোসল করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য আবশ্যক।’ (বুখারি ৮৭৯)


২️. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার


জুমার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরা, আতর ও সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দর সুবাস—সবই আল্লাহর প্রতি সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।


এটি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং অন্তরের শালীনতারও পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-


مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَتَطَهَّرَ بِمَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ، وَادَّهَنَ مِنْ دُهْنِهِ أَوْ مَسَّ مِنْ طِيبِ بَيْتِهِ، ثُمَّ رَاحَ فَلَمْ يُفَرِّقْ بَيْنَ اثْنَيْنِ، ثُمَّ صَلَّى مَا كُتِبَ لَهُ، ثُمَّ إِذَا خَرَجَ الإِمَامُ أَنْصَتَ—غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الأُخْرَى


‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করে, নিজের তেল ব্যবহার করে অথবা ঘরে থাকা সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর (মসজিদে) যায়, দু’জনের মাঝখানে ফাঁক করে বসে না, তার জন্য নির্ধারিত নফল নামাজ আদায় করে এবং ইমাম খুতবা দিতে এলে মনোযোগ দিয়ে শোনে-তার ঐ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত (গুনাহ) ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ৮৮৩)


৩️. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া


আগে গেলে বেশি সওয়াব। হাদিসে কুরবানির সাওয়াবের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে-প্রথম সময়ে গেলে যেন উট কুরবানি, তারপরে গেলে গরু, তারপর ছাগল কুরবানির সাওয়াব পাওয়া যায়।


এটি আমাদের শেখায়-আল্লাহর কাছে আগে যাওয়াই সৌভাগ্যের চিহ্ন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-


مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ، ثُمَّ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الْأُولَى، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الْخَامِسَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ حَضَرَتِ الْمَلَائِكَةُ يَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ


যে ব্যক্তি জুমার দিন জানাবাতের গোসলের মতো গোসল করে, তারপর প্রথম সময়ে (মসজিদে) যায়-সে যেন একটি উট কুরবানি করল। যে দ্বিতীয় সময়ে যায়-সে যেন একটি গরু কুরবানি করল। যে তৃতীয় সময়ে যায়-সে যেন শিংওয়ালা একটি ভেড়া কুরবানি করল।


যে চতুর্থ সময়ে যায়-সে যেন একটি মুরগি কুরবানি করল। আর যে পঞ্চম সময়ে যায়-সে যেন একটি ডিম সদকা করল। অতঃপর যখন ইমাম বের হন, তখন ফেরেশতাগণ খুতবা শোনার জন্য উপস্থিত হন। (বুখারি ৮৮১, মুসলিম ৮৫০)


৪️. সুরা কাহফ তিলাওয়াত


সুরা কাহফ নুর। এই নূর-পথভ্রষ্টতার অন্ধকারে দিকনির্দেশনার আলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-


مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ


‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠ করে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত নূর দান করা হয়।’ (মুসতাদরাকে হাকিম ৩৩৯২)


৫️. বেশি বেশি দরুদ পাঠ


জুমা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগের দিন। একটি দরুদ- রবের রহমত আর নবীর ভালোবাসার সেতু। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-


 إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَىَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَىَّ‏


‘তোমাদের সর্বোত্তম দিনগুলোর মধ্যে জুমু’আহর দিনটি উৎকৃষ্ট। কাজেই এ দিনে তোমরা আমার প্রতি বেশী পরিমাণে দরূদ পাঠ করবে। কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ (আবু দাউদ: ১৫৩১)


৬️. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা


খুতবা চলাকালীন নীরবতা ইবাদত। একটি শব্দও যেন মিস না হয়-কারণ, কখন কোন বাক্যটি জীবন বদলে দেয়, আমরা জানি না। এ জন্য খুতবার সময় কথা বলা পর্যন্ত নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-


إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ، وَالإِمَامُ يَخْطُبُ، فَقَدْ لَغَوْتَ


‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার পাশের লোককে বলো-‘চুপ থাকো’, তবুও তুমি অনর্থক কথা বলে ফেললে।’ (বুখারি ৯৩৪)


খুতবার সময় নীরবতা নিজেই একটি ইবাদত। কথা বলা তো দূরের কথা-অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়াও খুতবার ফজিলত নষ্ট করে দেয়।


বাস্তব জীবনে আমাদের করণীয়


১ জুমাকে ছুটির দিন নয়, ইবাদতের দিন হিসেবে নেওয়া


২ দুনিয়াবি কাজ থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া


৩ পরিবারকে জুমার আদব শেখানো


৪ দোয়ার বিশেষ সময় (আসর থেকে মাগরিব) কাজে লাগানো


৫ গুনাহ থেকে তাওবা করা


জুমা কেবল একটি নামাজ নয়, এটি একটি আত্মশুদ্ধির সুযোগ। সপ্তাহে একবার আল্লাহ আমাদের ডাকেন- ‘আমার দিকে ফিরে এসো।’ কত সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যে এই ডাক উপেক্ষা করে না। আসুন, আমরা জুমার দিনকে জীবন্ত করি-আমল দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, আল্লাহর স্মরণ দিয়ে। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করি-


اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنْ أَهْلِ الْجُمُعَةِ وَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا


উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাজ'আলনা মিন আহলিল জুমুআতি ওয়াগফিরলানা জুনুবানা।’


‘হে আল্লাহ! আমাদের জুমার দিনের হক আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন।’ আমিন।

Post a Comment

0 Comments